ershadmz July 3rd, 2009
৫০ সালের দাংগার বেশ আগে আমি মাস্টারপাড়ার রবীন্দ্র পাঠাগারের সদস্য হয়েছিলাম। সেখানে আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন আমির হোসেন কাকা। তিনি তখন মেট্রিক পরীশার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। পাঠাগারের পরিচালনায় ছিলে ফেণী কলেজ ও হাইস্কুলের বামপন্থী চিন্তাধারার শিক্ষকরা। ওই পাঠাগারেই আমি না বুঝেই বামপন্থী ধারার ছোটদের বই পড়তে শুরু করি। ওখানেই আমি পেন্সিল দিয়ে ছবি আঁকতে শিখি। হাজী মহসিনের ছবি এঁকে পুরস্কার পেয়েছিলাম। ৫১/৫২ সালের দিকে খাজা আহমদ সাহেব আমাকে ‘ছোটদের অর্থনীতি’ পড়তে দিয়েছিলেন। খাজা সাহেব তখন তাকিয়া বাড়ির একটা ঘরে থাকতেন। তখন তাঁর সংগ্রাম নামে একটা সাপ্তাহিক কাগজ ছিল। তখনকার মুরুব্বীরা খাজা সাহেবের কাছে যাওয়া পছন্দ করতেন না।
৫৩/৫৪ সালের দিকে আমি ফেণী মহকুমা ছাত্র ইউনিয়নের সাংস্কৃতিক সম্পাদক নির্বাচিত হই। ওই সালেই আমি বারিক মিয়া সাহেবের স্কুলে ধর্মঘট করানোর অভিযোগে গ্রেফতার হই। পরে আমার বাবা মুচলেকা দিয়ে ছাড়িয়ে আনেন।
ershadmz July 3rd, 2009
১৯৫০ এ আমি ফেণী মডেল স্কুলে পড়ি। এর আগে স্কুলের কথা বলেছি। স্কুলটি বারিক মিয়া সাহেবের স্কুল বলে পরিচিত ছিল। এই দাংগায় আমাদের পাড়া উকিল পাড়ার বাসিন্দা হিন্দু উকিল ও শিক্ষকরা ভারতে চলে গিয়েছিলেন। আমাদের পড়া মোটামুটি খালি হয়ে গিয়েছিলো। আমদের পুকুরের পুব পাশের বাড়িটি ছিলো মহেশ উকিলের। দক্ষিণে ছিলো সতীশ মোক্তারের বাড়ি। উত্তরে ছিলো মাখন কাকাদের বাড়ি। মাখন কাকারা দাংগার পর উকিল পাড়া ছেড়ে ডাক্তার পাড়া চলে গিয়েছিলেন।
দাংগার সময় মাখন কাকারা সবাই আমাদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। শুনেছি দাংগায় অংশ নিয়েছিল রামপুর পাটোয়ারী বাড়ির লোকেরা। এর পেছনে নেতা ছিলেন প্রখ্যাত বামপন্থী নেতা খাজা আহমদ সাহেব। কিন্তু দাংগার পর তিনিই প্রথম শান্তি কমিটি গঠণ করেন। দাংগার কারণে ফেণীর স্কুল কলেজ সব বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ওই দাংগায় ফেণীর বিখ্যাত উকিল গুরুদাস কর ও তাঁর ছেলে হরেন্দ্র কর মারা গিয়েছিলেন। তাঁদের বাড়িঘরেও আগুন দেয়া হয়েছিল। ওই দাংগায় ফেণীর ব্যবসা বাণিজ্যে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছিল। এখন উকিল পাড়ায় কোন হিন্দু বাসিন্দা নেই। ওই দাংগার কারনেই ফেণী হাইস্কুলের হিন্দু শিক্ষকরা আস্তে আস্তে চলে গিয়েছিলেন।
ershadmz July 1st, 2009
১। সাবেক পূর্ব পাকিস্তানে প্রথম বেসরকারী কৃষি কাগজের আমিই প্রতিস্ঠাতা। পত্রিকার নাম ফসল। এটা প্রতিস্ঠা করি ১৯৬৫ সালের ১৭ই মার্চ। এর আগে আমি অবজারভার ও সংবাদে সাড়া চার বছর চাকুরী করি। ৭০ সাল পর্যন্ত ফসল ফেণী থেকে প্রকাশিত হয়। ৭২ সালে এটা ঢাকায় স্থানান্তরিত হয়। ৭৫ সালে সরকার পত্রিকাটি বন্ধ করে দেয় অন্যান্য সব কাগজের সাথে। আবার প্রকাশিত হয় ১৯৭৬ সালে। প্রেসিডেন্ট জিয়ার সহযোগিতায় ফসল সারা দেশ ছড়িয়ে পড়ে। পত্রিকাটি এখন দৈনিক। কিন্তু প্রকাশিত হয়না।
২। ১৯৭৮ সালে সাপ্তাহিক রিপোর্টার প্রকাশ করি। এটি ছিল একটি নাগরিক কাগজ। ট্যাবলয়েড সাইজে আট পৃষ্ঠায় প্রকাশিত হতো। সেই সময়ের খুবই পপুলার কাগজ ছিল সাপ্তাহিক রিপোরটার। এখন এ কাগজটিও বন্ধ।
৩। ১৯৮৪ সালে মুজিবুল হায়দার চৌধুরীর সহযোগিতায় ইংরেজি দৈনিক দি ডেইলী নিউজ প্রকাশ করি। পত্রিকার এডিটর ছিলেন ওবায়দুল হক সাহেব। আমি ছিলাম ম্যানেজিং ডিরেক্টর ও ম্যানেজিং এডিটর। চৌধুরী সাহেব ছিলেন কোম্পানীর চেয়ারম্যান। কাগজটা বেশ কিছুদিন টিকে থাকলেও আমি মাত্র কয়েক মাস ছিলাম।
৪।১৯৯৬ সালে নিউনেশন ছেড়ে দিয়ে ডাচ বাংলা ব্যাংকের চেয়ারম্যান সাহাবুদ্দিন সাহেবের সহযোগিতায় দৈনিক রিপোর্টার প্রাকাশ করি। আমি ছিলাম সম্পাদক ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর। এখানেও আমি বেশীদিন টিকতে পারিনি। কোম্পানী তিন মাস চালিয়ে কাগজটি বন্ধ করে দেয়।
ershadmz June 30th, 2009
১। সংগঠন করা আমার প্রিয় কাজ ছিল। বল্যকালেই আমি আমার এলাকা উকিল পাড়ায় পাঠাগার স্থাপন করি। নাম ছিল ‘শিল্প ও শ্যামলী’। আমিই পাঠাগারের প্রতিস্ঠাতা , আমিই প্রধান নির্বাহী। বন্ধুরা আমার চাপে পড়ে দুই একটা বই দিয়েছিল। পাঠাগারটি ছিল আমাদের কাচারী ঘরে। একটা ছোট আলমারি আর কিছু চেয়ার। এগুলো ঘর থেকে নিয়েছিলাম।পাঠাগারটি বেশীদিন চলেনি।
২। ফেণী হাই স্কুলে গিয়ে দেয়াল পত্রিকা বের করার জন্যে স্যারদের উত্সাহিত করলাম। সাহায্য করার জন্যে এগিয়ে এলেন আমাদের বিজ্ঞান শিক্ষক রামপুরের আবদুস সাত্তার স্যার।আমাদের পত্রিকার নাম ছিল ‘আলো’। স্যার ছিলেন প্রকাশনা কমিটির সভাপতি। আমি ছিলাম সম্পাদক। পত্রিকাটি খুবই পপুলার ছিল।আমার বন্ধু কবি শামসুল ইসলাম ছিলো সহকারী সম্পাদক।
৩। এক সময়ের ফেণীর খ্যাতনামা সংগঠন সৃজনী সংসদের আমি ছিলাম প্রতিস্ঠাতা। এখন সংগঠণটি নেই। আমি ফেণী থাকলে এটা বন্ধ হতোনা। সৃজনী সংসদ ছিল ফেণীর শিক্ষিত মানুসের সংগঠণ। যারা ফেণী ক্লাবে যেতে চাইতোনা বা যেতে পারতোনা তাদের জন্যই ছিল সৃজনী সংসদ।
৪। ফেণী প্রেসক্লাবেরও আমি প্রতিস্ঠাতা সম্পাদক ছিলাম। ফেণীর এসডিও আনিসুজ্জামান ও এসডিপিআরও রশীদ খানের আন্তরিক সহযোগিতায় এ ক্লাব প্রতিস্ঠিত হয়। ফেণীতে তখন বেশ কিছু সাপ্তাহিক কাগজ ছিল। আমি ছিলাম সাপ্তাহিক ফসলের সম্পাদক। আমি চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের ও প্রতিস্ঠাতা সদস্য। এর মুল উদ্যোক্তা ছিলেন অবজারভারের ফজলুর রহমান, মর্ণিং নিউজের আবদুর রহমান, এপিপির নুরুল ইসলাম, ইত্তেফাকের মঈনুল আলম। তখন চট্টগ্রামের ডিসি ছিলেন কাজী জালাল ও এসপি ছিলেন খালেক সাহেব। আইউব খান ক্লাবের উদ্বোধন করেছিলেন।
৫। জাতীয় প্রেসক্লাবের কবিদের সংগঠণ কবিতাপত্রেরও আমি প্রতিস্ঠাতা। এবার এই সংগঠনটি সাত বছরে পড়লো। ২০০২ সালে আন্তর্জাতিক কবিতা পরিষদের পুরস্কার পাওয়ার পর দেশে ফিরে আমি এই প্রতিস্ঠান প্রতিস্ঠা করি। কবিতাপত্র এখন জাতীয় প্রেসক্লাবের কবিদের প্রাণ। প্রতি মাসের শেষ তারিখে ক্লাবে কবিতা পাঠের নিয়মিত আসর অনুস্ঠিত হয়। এই তারিখে কবিতাপত্র নামে একটি ম্যাগাজিনও প্রকাশিত হয়। এতে প্রায় ৩০টি কবিতা ছাপা হয়। প্রখ্যাত গীতিকার কেজি মোস্তফা কবিতাপত্রের সম্পাদক।
ershadmz June 30th, 2009
আমার বাবার নাম আবদুল আজিজ মজুমদার। বাবার দাদা ও পীরদাদার বাড়ি ছিল ফেণীর শহরের উত্তরে পেঁচিবাড়িয়া গ্রামে। গ্রামটি এখন আনন্দপুর ইউনিয়নে। বাবার জন্ম ফেণী শহরেই। বাড়ির সামনের স্কুলেই বাবা লেখাপড়া করেছেন। বাবা খুবই দয়ালু ও নরম হৃদয়ের মানুস ছিলেন। আত্মীয় স্বজনকে খুবই সাহায্য করতেন। খরচের ব্যাপারেও বাবা ছিলেন দরাজদিল। ফেণী শহরে বাবার বহু নামীদামী বন্ধু ছিলো। শহরে সবাই তাঁকে এক ডাকে চিনতো। অল্প বয়সেই বাবা পারিবারিক ব্যবসায় যোগ দেন। প্রথমে ফেণীতে ও পরে রেংগুন যান ব্যবসার যান। সেখানে পরিবারের ধানের ব্যবসা ছিল। রেংগুন বাবা নাকি কয়েকবার থাইল্যান্ডে গিয়েছিলেন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর রেংগুনে ভারতীয় খেদাও আন্দোলন শুরু হওয়ায় বাবা চট্টগ্রাম চলে আসেন এবং নিজের ব্যবসা শুরু করেন।চট্টগ্রামের রিয়াজুদ্দিন বাজারে বাবার ব্যবসা ছিলো।
শুনেছি, পশ্চিম বাংলার মেদিণীপুরে এ্যারোড্রাম নির্মানের কাজে বাবা একজন সাব কন্ট্রাক্টর ছিলেন। বাবা বোধ হয় ৪৫ সালের দিকে ফেণী আসেন। তখন আমার বয়স ৫ বছর। ওই বছরই আমি বাড়িতে লেখাপড়া শুরু করি।
ershadmz June 30th, 2009
ক্লাশ সিক্স পাশ করলে ফেণী মডেল স্কুল আমাকে ছেড়ে যেতে হবে। কারন ওখানে ক্লাশ সেভেন নেই। মা আমার জন্যে একটা বাইশ ইণ্চি সাইকেল কেনার কথা বললো বাবাকে। বাবা বলেছিলেন আজিজ কাকাকে। আজিজ কাকার সাইকেলের দোকান ছিল। সাইকেলের দাম মনে হয় ৫০ টাকা ছিল। আমাদের বাড়ি থেকে ফেণী হাইস্কুল একটু দূরে ছিল। মা ভেবেছিলো অতদূর পথ হেটে যাওয়া ঠিক হবেনা। হাইস্কুলে ভর্তি হওয়ার জন্যে মা শার্ট ও হাফ পেন্টের অর্ডারও দিয়েছিলো। সেই সাইকেল আর কেনা হয়নি। মা ১৯৫১ সালের অক্টোবর মাসেই আমাদের চলে গিয়েছিল। মা’র টাইফয়েড ও নিউমুনিয়া হয়েছিল। বহু চেস্টা তদবীর হয়েছিল। তখন ওসব রোগের কোন চিকিত্সা হতোনা।
ershadmz June 21st, 2009
আমার বাবা অসুস্থ হয়ে পড়েন ১৯৬৪ সালের অগাস্টের দিকে। আমি তখন সংবাদের চট্টগ্রাম প্রতিনিধি।অবজারভার ছেড়ে সংবাদের এসেছিলাম রাজনৈতিক কারনে।তখন সংবাদের এডিটর ছিলেন জহুর হোসেন চৌধুরী। শহীদুল্লাহ কায়সার ছিলেন নির্বাহী সম্পাদক।ওই ৬৪ সালের শেষের দিকেই আমি সংবাদ ছেড়ে ফেণী ফিরে গেলাম ঢাকা এসেছিলাম পড়ালেখা করার জন্যে ১৯৫৮ সালে। শিশুকাল থেকেই ফেণীতে ছিলাম।ফেণী মডেল স্কুল, ফেণী হাই স্কুল ও ফেণী কলেজে পড়েছি।লেখাপড়া শেষ করে ঢাকায় থেকে গেলাম কাজ শুরু করি প্রথমে অবজারভারে ও পরে সংবাদে। ১৯৬৯ সালের শেষদিকে আবার ফিরে আসি ঢাকায়। সেই থেকে এখনও ঢাকায় আছি। এই লেখায় আমি শুধু ৬৪ থেকে ৬৯ এর কথা বলবো।ছাত্র জীবনের কথা বাদ দিলে আমার পূর্ণাংগ রাজনীতির জীবন শুরু হয়েছিল ১৯৬৪ সালে। আমি ন্যাপ ও ন্যাপ সমর্থক কৃষক সমিতির সাথে জড়িত হই। ভাবলাম বাড়ীতে থাকলেবাবার দেখাশুনা হবে,রাজনীতিও হবে।আমি বড়ছেলে। সংসারের দায়িত্ব আমারই নেয়া উচিত ছিল। সত্যিকার অর্থে আমি তা পারিনি। আমার ছোটভাই ইসহাকই সংসারের সব কাজ দেখা শুনা করতো। ও তখন কুঠিরহাট বিষ্ণুপুর হাইস্কুলে বিজ্ঞানের শিক্ষকতা করতো। তেমন বেতন ছিলনা। হয়ত একশো দেড়শো হবে। আরও কমও হতে পারে। স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন তালেব আলী সাহেব।পরে তালেব সাহেব আওয়ামী লীগের এমপি হয়েছিলেন। তিনি একজন সত্মানুষের প্রতীক।তখন পর্যন্ত রাজনীতিতে সত্ মানুষের প্রয়োজন ছিল। আদর্শের প্রয়োজন ছিল। এখন আর প্রয়োজন নেই। এখন রাজনীতি পুরোদমে একটা ব্যবসা। যে কোন দলের ওয়ার্ড সভাপতি হতে পারলেই টাকা পয়সা আসতে শুরু করে।ফেণীতে গিয়ে প্রথমে একটি সাপ্তাহিক কাগজের ডিক্লারেশনের জন্য দরখাস্ত করি।নোয়াখালীর ডিসি ছিলেন আমিনুল হক সাহেব। আমার কাছে মনে হতো তিনি একজন ভালো মানুষ ছিলেন। ডিক্লারেশনের ব্যাপারে প্রশাসনের সবাই আমাকে সহযোগিতা করেছেন। এসবি’র অফিসার আমাকে বলেছিলেন, আপনার নামে দরখাস্ত করবেন না। তাই আমি দরখাস্ত করেছিলাম আমার জেঠাত ভাই নুরুল ইসলাম সাহেবের নামে। ট্রান্ক রোডে আমার জেঠার একটি বিল্ডিং ছিলো। সেই বিল্ডিংয়ের বেসমেন্টে আমি অফিস করেছিলাম। কাগজের নাম প্রথমে দিয়েছিলাম স্বদেশ। বলা হলো সেই নামে কাগজ আছে। পরে নাম ফসল। এ নাম দেয়ার পেছনে একটা কারণ ছিলো। সেটা হলোপাঠকরা সহজে যেন পত্রিকার নাম উচ্চারন করতে পারে। সাপ্তাহিক ফসলের প্রথম সংখ্যা বেরিয়েছিল ১৭ই মার্চ বুধবার। প্রতি কপির দাম ছিলো ১২ পয়সা। সেই সময়ে ফসলের সার্কুলেশন ছিল সবচে বেশী। কাগজের সম্পদনা ছিলো স্থানীয় অন্য কাগজের তুলনায় অনেক উন্নত। কাগজের সার্কুলেশন ও রিপোর্টিংয়ের ব্যাপারে আমাকে নিয়মিত সাহায্য ও সহযোগিতা দিয়েছে ছাত্র ইউনিয়ন ও ন্যাপের কর্মীরা। আমার ভাই সালু নুরু ছাড়াওকাগজে নিয়মিত কাজ করতো বাদল নাগ ও হুমায়ুন কবির সেলিম।আরও অনেকেই আমাকে সহযোগিতা করেছেন যাদের নাম এখন আমার মনে নেই। তখনকার বার লাইব্রেরীতে আমার অনেক বন্ধু ছিলো। সবচে প্রিয় বন্ধু ছিলো রফিকুজ্জামান ভুঁইয়া। আসলে ভুঁইয়া ছিলো ওর ডাক নাম। ওর বাবা ওয়াহিদুজ্জামান রফিককে আদর করে ভুঁইয়া ডাকতো। রফিক ১৯৭৯ সালে জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিল। ফেণী কলেজে পড়ার সময় সে কলেজ মজলিশেরও জেনারেল সেক্রেটারী নির্বাচিতহয়েছিল। রফিক আমার প্রিয়তম বন্ধু ছিল।ওর মতো ভাল মানুষ এখন রাজনীতিতে দেখতে পাওয়া যায়না। শুধু ওর কথা বলতে গেলেও আমি একটি পূর্ণাংগ বই লিখতে পারবো।আমার আরেকজন প্রিয় মানুষ ছিলেন কাদের নেতা।এ রকম ভালো জীবনে খুব কম দেখেছি। তিনি ছিলেন চিরকুমার। চাত্র বয়স থেকেই তিনি আমাকে নানা ভাবে সহযোগিতা করেছেন। তাঁকে সবাই কাদের নেতা বলেই জানতো।ফেণীর রাজনৈতিক জীবনে আমাকে সবচেয়ে বেশী সহযোগিতা করেছেন ওয়াদুদ ভাই। তিনি এখন ফেণীর পথ পত্রিকার সম্পাদক। আরেকজনের কথা উল্লেখ না করলে মন মানছেনা। তিনি হচ্ছেন মাওলানা ওয়াজি উদ্দিন। তিনি ছাত্র ইউনিয়ন নেতা।মাদ্রাসার লেখাপড়া শেষ করে কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি স্বাধীনতা বিরোধীদের হাতে ধরা পড়ে শহীদ হন। তিনি জীবিত থাকলে এদেশের প্রথম কাতারের একজন সত্ রাজনীতিক হতেন। ৬৯ সালে সারা পূর্ব বাংলার রাজনীতি ছিল সমুদ্রের উত্তাল তরংগের মতো।এই তরংগের ঢেউ ফেণীতেও পৌঁছে যায়।ওই আন্দোলনের ফলেই ৭০ এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ একচেটিয়া ভোট পায়।রাজনীতিতে আমাকে বাম চিন্তাধারার লোক মনে করা হতো। আমি মাওলানা ভাসানীর মতো ধর্মে বিশ্বাস করতাম। আমি ইসলামকেই রেডিকেল ধর্ম মনে করি।ভাসানী সাহেব বলতেন ইসলামী সমাজতন্ত্র। সোজা কথায় বলা যেতে পারে আমি একজন মানবতাবাদী ছিলাম এবং এখনও আছি। ওই সময়ে আমি সারা নোয়াখালী জেলায় বক্তৃতা দিয়ে বেড়িয়েছি। ফেণীর বহু অনুস্ঠানে প্রধান অতিথি হয়েছি।ফেণীতে থাকার সময়ে আমার প্রধানতম অর্জন ছিল ফেণী প্রেসক্লাব প্রতিস্ঠা করা। এই ব্যাপারে আমাকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছিলেন এসডিপিআরও রশীদ খান ও এসডিও আনিসুজ্জামান খান।ক্লাবের প্রথম কমিটির সভাপতি ছিলেন আনিসুজ্জামান খান বা সাইফুদ্দিন আহমদ। সেক্রেটারী ছিলেন রশীদ খান। অবজারভারের সংবাদ দাতা নুরুল ইসলাম সাহেব ছিলেন সহ সভাপতি। আমি ছিলাম সহকারী সেক্রেটারী। আমরা এই ব্যবস্থা নিয়েছিলাম ক্লাবের জায়গা পাওয়ার জন্যে। বর্তমান ভবনটি লীজ পাওয়ার জন্যে সবচেয়ে বেশী সহযোগিতা করেছেন মহকুমা হাকিম সাইফুদ্দিন সাহেব।লীজের টাকা দিয়েছিলেন কুণ্ডেশ্বরী ঔষধালয়ের সত্যবাবু। টাকার জন্যে আমি কুণ্ডেশ্বরীর হেড অফিস চট্টগ্রামের গহিরা গিয়েছিলাম। দ্বিতীয় অর্জন ছিলো সৃজনী সংসদ প্রতিস্ঠা করা। ফেণী ক্লাব ছিল সরকারী অফিসার ও ফেণীর এলিটদের ক্লাব।ষে কেউ ইচ্ছা করলেই এই ক্লাবের মেম্বার হতে পারতোনা।তরুন শিক্ষিত ব্যবসায়ী, উকিল,শিক্ষক, শিল্পীদের নিয়ে আমি সৃজনী সংসদ প্রতিস্ঠা করি। এখন এই সংসদ নাই। আমি ফেনী থাকলে এটাকে বাঁচিয়ে রাখতাম।কেন যে বন্ধুরা এটা টিকাতে পারলোনা তা বুঝতে পারলাম না।সত্যি কথা বলতে কি সংগঠন করতে হলে অন্তরের একটা টান থাকতে হয়। ভাবতে হয় সংগঠনটা আমি।এবার সাংবাদিকতা জীবনের কিছু কথা বলে এই নিবন্ধ শেষ করতে চাই। রাজনীতির কথা বলতে গেলে আনেক বেশী কথা বলতে হবে। এই ফাঁকে আমার বাবার কথা কিছু বলতে চাই। তিনি ছিলেন চৌকষ ও সখিন মানুস।ফেণিতে তাঁর প্রচুর বন্ধু ছিল। তাঁদের সবার নাম এখানে উল্লেখ করা সম্ভব নয়। বাবার প্রিয় মানুসের ভিতর ছিলেন নরেন ডাক্তার কাকা, আজিজ কাকা, সতীশ বর্ধন কাকা, সিনেমা হলের আফজাল কাকা। অনেক সরকারী অফিসারও তাঁর বন্ধু ছিলেন। অনিশীলন আন্দোলনের বাঘা মজুমদারের সাথেও তাঁর খাতির ছিলো। বাবার দিলটা ছিলো খুবই বড়। যেকোন সময়ে যেকোন লোকের সাহায্যে এগিয়ে যেতেন। আগেই বলেছি তিনি ১৯৬৪ সালে তিনি সারকোমায় (বোন ক্যান্সার) আক্রান্ত হন।চিকত্সা চলে দীর্ঘ চার বছর। এ সময়ে নরেন কাকা আমাদের সীমাহীন সাহায্য করেছেন।বাবা মারা যান ১৯৬৮ সালের ৫ই মার্চ। টাইফয়েড ও নিওমুনিয়ায় আমার মা মারা যান ১৯৫১ সালের অক্টোবরের শেষের দিকে।তখন আমি ক্লাশ সিক্সে পড়ি।ঢাকায় সাংবাদিকতা করার কারণে স্থানীয় প্রশাসন আমাকে কিছুটা সম্মান করতো। কিন্তু স্থানীয় উকিল ও ব্যবসায়ীরা আমাকে সহযোগিতা করতে চাইতোনা।এটা হয়তো আমার স্বাধীনচেতা মনোভাবের জন্যে। তখন আমি কাউকে তোয়াজ করতামনা। বয়সের কারণে এখন অনেকটা নরম হয়ে গেছি। অনেক বেশী সমঝোতায় বিশ্বাস করি। তাছাড়া সমাজ এখন আগের চেয়ে অনেক খারাপ হয়ে গেছে। সমাজের উচু তলায় এখন মন্দলোকের সংখ্যা ৯০ ভাগের বেশী। নিচু তলায়ও মন্দ লোকের সংখ্যা ৫০ ভাগের কম নয়। মনটা আগের মতো থাকলেও দেহটা পোষ মেনে নিয়েছে। তখন আমি ছিলাম ২৫ বছরের যুবক। এখন বৃদ্ধ।বাবা ভেবেছিলেন বিয়ের ব্যবস্থা হয়ে গেলে আমার রাজনীতি ও বিপ্লবী মনোভাব পোষ মানবে। ৬৬ সালের সেপ্টেম্বরে বিয়ে করিয়ে দিয়েছিলেন।কিন্তু তা হয়নি। ৬৯ সাল পর্যন্ত আমি ফেণীতে রাজনীতি করি। তারপর ৬৯ এর শেষের দিকে ঢাকা চলে আসি। তখন সাপ্তাহিক পূর্বদেশ দৈনিকে রূপান্তরিত হয়েছে। মাহবুব ভাইকে বলার সাথে সাথেই তিনি রাজী হয়ে গেলেন। পূর্বদেশের একজন সিনিয়র অর্থনৈতিক রিপোর্টারের প্রয়োজন ছিল। আমাকে নেয়ার ব্যাপারে বার্তা সম্পাদক এহতেশাম হায়দার চৌধুরী মিয়া ভাইয়ের আগ্রহ ছিল খুব বেশী। সেই যে আমি ঢাকায় এসেছি আর ফিরে যাইনি। অনেক ঘটনার মাঝে ফেণীর সাংবাদিকতা জীবনের দুটো ঘটনা বলেই এই স্মৃতিচারণ এখানেই শেষ করতে চাই।একটি হলো মহকুমা হাসপাতালের ডাক্তার আবুল কাশেম সাহেবের মামলা। দ্বিতীয়টি হলো মহকুমা হাকিমের পেশকার সফিক চৌধুরীর মানহানির মামলা। দুটোতেই আমি জিতেছিলাম। আবুল কাশেম সাহেব ছিলেন ফেণীর এলিট শ্রেণীর কাছে খুবই জনপ্রিয় ডাক্তার। কাশেম সাহেব মানুষটি ছিলেন খুবই অনৈতিক। যেকোন অন্যায় কাজ করতে তাঁর বুক কাঁপতোনা। সাপ্তাহিক ফসল এ প্রায়ই নিয়মিত তাঁর অনৈতিক কাজের খবর ছাপা হতো। কোন ধরণের হুমকি ধামকি বা চাপ আমাকে নোয়াতে পারেনি। একদি আমাদের পাশের বাড়ির কে যেন মারামারি করে আহত হয় এবং খুবই অসুস্থ হয়ে পড়ে। আমি তাঁকে নিয়ে হাসপাতালে যাই। আমি ভাবি নাই যে, কাশেম সাহেব আমার উপর প্রতিশোধ নেয়ার জন্যে প্রচন্ড রেগে ছিলেন। যদি বুঝতে পারতাম তাহলে হয়ত আমি হাসপাতালে যেতাম না। তিনি আমার সাথে খুবই ভাল ব্যবহার করেছেন। সময়টা ছিল সকাল এগারটার দিকে। বিকেলে জানতে পারলাম আমার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবঁ ওয়ারেন্ট ইস্যু হয়েছে। মামলাটি ছিল সরকারী কর্মচারীর কর্তব্য পালে বাধা দান করা ও প্রাণ নাশের হুমকি দেয়া। বড়ই মারাত্মক মামলা। জামিন পেয়েছিলাম। আমার গ্রেফতারের কথা ঢাকার কাগজে ছাপা হয়েছে। মর্ণিং নিউজ ও দৈনিক পাকিস্তানে ঘটনার নিন্দা করে সম্পাদকীয় লেখা হয়েছে। তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রী জনাব ফজলুল বারী চৌধুরী আমাকে কাশেম সাহেব সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলেন। আমি বলেছিলাম, তিনি একজন ভাল ডাক্তার। কিন্তু মানুস হিসাবে পশুর চেয়ে অধম। মন্ত্রী সাহেব আও জানতে চাইলেন, আমি কি চাই? আমি বলেছিলাম, অবিলম্বে ডাক্তারের বদলী চাই। মন্ত্রী সাহেব কাশেম ডাক্তারকে চট্টগ্রাম বদলী করে দিয়েছিলেন। মামলা চালাবার জন্যে প্রথম দিকে ফেণীতে আমি কোন উকিল পাইনি। সব উকিল ছিল কাশেম সাহেবের পশে। বাধ্য হয়ে আমি মাইজদী থেকে প্রখ্যাত আইনজীবী রায় সাহেব নগেন শূরকে অনুরাধ করলাম আমার মামলা চালাবার জন্যে। তিনি রাজীও হলেন। কাশেম সাহেব বদলী হয়ে যাওয়াতে তাঁর পক্ষের সাক্ষীরা কেউ আর সাক্ষী দিতে রাজী হলোনা। তাছাড়া চট্টগ্রাম থেকে মামলা চালানো কাশেম সাহেবের জন্যে কস্টকর হয়ে পড়েছিল।শেষ পর্যন্ত দূর্ণীতির অন্য মামলায় কাশেম সাহেবের চাকুরী চলে গিয়েছিল। তিনি বেশ কিছুদিন জেলও খেটেছিলেন। তাঁর ছেলে জিয়াউদ্দিন বাবলু এরশাদ সাহেবের প্রতিমন্ত্রী হওয়ার পর কাশেম সাহেব চাকুরী ফিরে পেয়েছিলেন এবং পেনশনও পেয়েছিলেন।সফিক পেশকার সাহেবের মামলাটি ছিলো মানহানির মামলা। তিনি ঘুষ খান এই মর্মে ফসল এর চিঠিপত্র কলামে একটি ছাপা হয়েছিল। ওই খবরের বিরুদ্ধে সফিক সাহেব মামলা করেছিলে। এক্ষেত্রেও ফেণীর উকিলরা আমার পক্ষে লড়তে রাজী হননি। আমি রায় সাহেবকেই আমার উকিল ঠিক করেছিলাম। এই মামলা পরে সফিক সাহেব প্রত্যাহার করেছিলেন।আরেকটি মামলার কথাও উল্লেখ করতে চাই। সেটা ছিল আদালত অবমাননার মামলা। এটা ছিল একটু টেকনিকেল মামলা। অজ্ঞতার কারণেই এই মামলা হয়েছিল।ফেণী কলেজের ছাত্র জয়নাল হাজারীকে প্রিন্সিপাল সফিক সাহেব থার্ড থেকে ফোর্থ ইয়ারে প্রমোশন দেওয়ায় হাজারী মামলা করেছিলো। মামলার রায় প্রকাশ করতে গিয়ে আমি ভুল করেছিল। রায় যখন ঘোষণা করা হয় তখন হাজারী ফোর্থ ইয়ারে পড়ে। কিন্তু রায়ের কোথাও ফোর্থ ইয়ার লেখা ছিলনা। লেখা ছিল থার্ড ইয়ার। মামলাটি হয়েছিল সোয়োমটো। হাইকোর্টে আমার পক্ষে মামলা পরিচালনা করেছিলেনব্যারিস্টার মওদুদ। আমি ক্ষমা প্রার্থনা করে ওই মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়েছিলাম।
ershadmz June 12th, 2009
ছেলেবেলা থেকেই আমার ভিতর মুরুব্বীয়ানার একটা ভাব ছিলো। স্কুলেই আমি নেতা ছিলাম। ম্যাগাজিন প্রকাশ করা, নাটক করা, সাংস্কৃতিক অনুস্ঠান করা, নানা ধরনের প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহণ করা ও অর্গেনাইজ করা ছিল আমার কাজ। শিক্ষকদের সাথে ছিল ঘনিস্ট যোগাযোগ। আমি যখন ফেণী মডেল স্কুলে পড়ি তখন আমার সাথে চার/পাঁচটা মেয়ে পড়তো। তাদের সবার নাম এখন তেমন মনে নেই। যাদের মনে আছে তাদের নাম উল্লেখ করছি। কিরণ, শেলি, রোকেয়া। কিরণ কাজী গোলাম রহমানের( মিয়া) বোন। শেলি ডাঃ ফজলুল করিমের মেয়ে। রোকেয়া রামপুর সওদাগর বাড়ির মেয়ে। গোলাম রহমানের সাথে আমার ছিল গভীর বন্ধুত্ব। ফলে তাদের বাসায় আমার নিয়মিত যাতায়াত ছিলো। ওর অনেক বোন ছিল। অনেকে মনে করতো মিয়ার বোনদের কারো কারো সাথে আমার প্রেম ছিল। আসলে তা ছিলনা। মিয়ার মা আমাকে খুবই স্নেহ করতেন।
যখন আমি ক্লাশ নাইনে পড়ি তখন উত্তরা গুহ ছিলেন আমার প্রাইভেট টিউটর। তিনি ছিলেন আমার পাশের বাসার বাসিন্দা। তাঁর ছিল এক অপরুপ সুন্দরী মেয়ে। নাম পুর্ণিমা। সে পড়তো ক্লাশ সিক্সে। পুর্ণিমাকে আমার খুবই ভাল লাগতো। প্রেম কিনা জানিনা। পুর্ণিমাও বুঝতো তাকে আমি খুবই পছন্দ করি। মিয়ার বোন আয়েশা বিষয়টা জানতো। আয়েশা মাঝে ঠাট্টা করতো। বিষয়টা জানতে পেরে উত্তরা বাবু পুর্ণিমাকে কোলকাতা পাঠিয়ে দেন। তখন আমি কলেজের ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্র।
ershadmz June 11th, 2009
স্মৃতিকথা কতটুকু সত্য আর কতটুকু মিথ্যা বলা সত্যিই কঠিন।
তবুও স্মৃতিকথা বলতে খুবই ভাল লাগে। এখন যা বলছি তাকে
স্মৃতিকথা বলা যাবে কিনা আমার প্রশ্ন আছে।
১৯৬১ সালে আমি পাকিস্তান অবজারভারে জয়েন করি। পদবী ছিল
নবীশ বানিজ্যিক রিপোর্টার। বানিজ্যিক পাতার জন্যে রিপোর্ট করা।
ওই পাতার দায়িত্বে ছিলেন শিক্ষাবিদ শামসুল হুদা সাহেব। আমি তাঁকে
স্যার বলে সম্বোধন করতাম। কারণ তিনি পেশাগত ভাবে একজন শিক্ষক
ছিলেন।এখনও তাঁকে শিক্ষক বলেই মনে করি।
অবজাভারের নিউজ এডিটর মুসা সাহেব তখন লন্ডনে প্রশিক্ষন লাভ
লাভ করছিলেন। মাহবুব জামাল জাহেদী সাহেব নিউজ এডিরের দায়িত্ব
পালন করছিলেন। অবজারের সবাই আমাকে আদর করতো। আমি
লেখাপড়া কম জানতাম বলে সবার কথা শুনতাম।সবার কাছ থেকে
শিখার চেস্টা করতাম। অল্প সময়ের মধ্যেই আমি সবার প্রিয় হয়ে
গেলাম। হুদা সাহেব আমাকে আশাতীত আদর করতেন। তিনি খুব নরম
মানুষ বলেই তাঁর কাছে কাজ শিখতে পেরেছিলাম।
তখন চীফ রিপোর্টার ছিলেন শহীদুল হক সাহেব। যিনি পরে বাংলাদেশ
টাইমসের সম্পাদক হয়েছিলেন। এছাড়াও অনেক ডাকসাইটে রিপোর্টার
অবজারভারে কাজ করতেন। ওদের সাথে কাজ করতে পেরেছি বলে
আমি নিজেকে ধন্য মনে করি।
তখন অবজারভারের সম্পাদক ছিলেন আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন ব্যাক্তি
আবদুস সালাম। মোয়াজ্জেম হোসেন বুলুর জেঠা বলে আমিও তাঁকে জেঠা
বলে ডাকতাম।অনেক রাত্রে তাঁর বাসায় ছিলামও। তখন বাসা ছিল পুরণো
নাসির উদ্দিন রোডে। আর অবজারভার অফিস ছিলো খুব কাছেই। জনসন
রোডে,বাংলাবাজার গার্লস হাই স্কুলের লাগোয়া।
আমার নবীশী কাটার আগেই দুবার শাস্তি হয়ে গেলো। একবার ক্যামিস্ট্রি
বানান ভুল লোখার জন্যে,আরেকবার চল্লিশ পয়সার জায়গায় চল্লিশ টাকা
লিখার জন্যে। প্রথমবার একটাকা যা বেতন থেকে কাটা হয়নি। দ্বিতীয়বার
পাঁচ টাকা। শেষ জরিমানাটা বেতন থেকে কাটা হয়েছিল। চাকরী প্রায়
যায় যায়।
এসময়ে অবজারভারের ম্যানেজিং এডিটর ছিলেন আবদুল গণি হাজারী
সাহেব। তিনি খুব মিষ্টি মানুষ ছিলেন।তাঁর কারনেই আমার চাকরীটা
যায়নি। ডাকসাইটে শ্রমিকনেতা মাহবুবুল হক প্রথমে ফেণীতে পল্লীবার্তা
প্রকাশ করেন।পরে অবজারভার গ্রুপে জয়েন করেন কমার্শিয়াল ম্যানেজার হিসাবে।
তিনিই আমাকে নবীশ হওয়ার সুযোগ করে
দিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন আমার আপন বড় ভাইয়ের মতো। তাঁর স্নেহ
মমতা ভালবাসার কথা এ জীবনে ভুলতে পারবোনা। পরবর্তী পর্যায়ে তিনি
অবজারভার গ্রুপের ম্যানেজিং এডিটর ও দৈনিক পূর্বদেশের সম্পাদক
হয়েছিলেন। পল্লীবার্তাই পূর্বদেশে রূপান্তরিত হয়।তিনি পাকিস্তান পার্লামেন্টেরও বাঘা মেম্বার ছিলেন।
ইতোমধ্যে নিউজ এডিটর মুসা সাহেব লন্ডন থেকে ফিরে এলেন।
জাহেদী সাহেব এডিটোরিয়ালে ফিরে গেলেন। নবীশ সাংবাদিক এরশাদ
মজুমদারের ত্রাহি অবস্থা। মনে হলো চাকরীটা আর থাকবেনা। বুলু
বললো এত ভয় পাওয়ার কি আছে? আমি আছি না। অবশ্য এরপরে
অবজারভারে বেশীদিন চাকরী করিনি।
এখনকার পত্রিকায় রংচং বেড়েছে, পৃষ্ঠাও বেড়েছে। মান বেড়েছে কিনা
এ ব্যাপারে আমার ভিন্নমত আছে। পত্রিকাগুলো এখন রাজনীতির মাপকাঠিতে
পরিচালিত হয়। এখন কাজ জানাটা বড় কথা নয়। কে কোন দল করে
সেটাই যোগ্যতার প্রধান মাপকাঠি। ৫০/৬০ সালের দিকে এ অবস্থা ছিলনা।
কাজ জানাটাই ছিল প্রধান মাপকাঠি। বামপন্থী বলে পরিচিত জাহেদী,কে জি মোস্তফা,
ওয়াহিদুল হক, জাহিদুল হক আরও অনেকে অবজারভারে কাজ
করতেন। এ ব্যাপারে মালিকের কোন মাথা ব্যথা ছিলনা। সোজা কথা হলো কাজ
জানো কিনা। এখন দলবাজী করলেই কাজ হবেনা। গ্রুপবাজীও করতে হবে।
১৯৬৯ সালের শেষের দিকে আবার অবজারভার গ্রুপে ফিরে আসি।এবার
সিনিয়র রিপোর্টার হিসাবে পূর্বদেশে কাজ শুরু করি। মাহবুব ভাই তখন
পূর্বদেশের সম্পাদক। মিয়া ভাই মানে এহতেশাম হায়দার চৌধুরী নিউজ
এডিটর ছিলেন। বাংলা কগজের ভিতর পূর্বদেশ তখন বহুল প্রচারিত ও
নামডাকে ভরা। এছাড়া আমি বানিজ্য পাতার দায়িত্বেও ছিলাম। পূর্বদেশে
কাজ শুরু করার ব্যাপারে একটা কাহিনী আছে বেতন নির্ধারণ নিয়ে। আমার
কাছে এটা একটা মজার গল্প মনে হয়।
নিয়োগপত্র ইস্যু করার আগে আমি চুক্তিভিত্তিক কাজ শুরু করলাম। চুক্তিটাও
ছিল মজার। চুক্তিটা আমি নিজেই ঠিক করেছিলাম। বেতন নির্ধারনের জন্যেই
এ পথ বেছে নিয়েছিলাম। ঠিক হলো ফার্স্টলিড ৫০ টাকা,সেকেন্ড লিড বা
তত্সম রিপোর্টের জন্যে ৩০ টাকা, থার্ড লিডের জন্যে ১০ টাকা। সিংগেল
কলাম হেডিং স্টোরি ফ্রি। বুদ্ধিটা ছিল মিয়া ভাইয়ের।তিনি আমাকে নিতেই চান।
এভাবে ২/৩ মাস চললো। প্রতি মাসেই আমি
খুব আরামে ১৩/১৪শ টাকা ড্র করতে শুরু করলাম। এর উপরে ছিল বাণিজ্য
পাতার জন্যে ২শ টাকা। এসব কান্ডকারখানা দেখে চৌধুরী সাহেবের চোখ
ছানাবড়া। ব্যাপারটা কি? এ কোন রিপোর্টার যে বিল করে মাসে ১৩/১৪শ
টাকা নিয়ে যায়। আবার বাণিজ্য পাতার জন্যে ২শ টাকা।
রিপোর্টারটা কে তাকে একবার দেখা দরকার। তার আগে মাহবুব ভাইয়ের
ইন্টারভিউ। সরাসরি প্রশ্ন- তুমি কত টাকা বেতন চাও।আগেই বলেছি তিনি
ছিলেন আমার আপন বড় ভাইয়ের মতো। তাই মনের ভিতর তেমন ডর ভয়
ছিলনা। বললাম দুটি ইনক্রিমেন্ট সহ সহকারী সম্পাদকের স্কেল দিতে হবে।
এরপরে চৌধুরী সাহেবের সাথে সাক্ষাতকার। ভয়ে বুক কাঁপছিলো। মাহবুব
বললেন ভয়ের কিছু নেই। সব ঠিকঠাক আছে।
নির্ধারিত তারিখে চৌধুরী সাহেবের চেম্বারে গেলাম। সাথে মাহবুব ভাইও ছিলেন।
কোম্পানীর চেয়ারম্যান ও ডাকসাইটে আইনজীবি হামিদুল হক চৌধুরী
বাংলায় কথা বললে নোয়াখালীর ভাষায় কথা বলতেন। শুদ্ধ বাংলা বলতেন না
বা বলতে পারতেন না। প্রথমে প্রশ্ন করলেন, এত বেতন দিয়া কি করবা?
বিয়েশাদী করছো নাকি? বাড়ী কোথায়? মাহবুব মিয়া বা মুসার আত্মীয়
হও নাকি?আমি কোন উত্তর দিইনি। চৌধুরী সাহেবও উত্তরের অপেক্ষায়
ছিলেন না। শেষ প্রশ্ন করেছিলেন এপয়েন্টমেন্ট পেলে এত কাজ করতে
পারবা নাকি, না সবার মতো ঢিলা দিয়া দিবা। ইন্টারভিউ শেষ, চলে
আসবো এমন সময় প্রশ্ন করলেন- ক্রেডিট বাজেটিং বোঝ। এবিষয়ে একটা
রিপোর্টিং কর। পরে বুঝতে পেরেছিলাম কেন তিনি ঐ রিপোর্টটি কেন
করতে বলেছিলেন।
ershadmz June 11th, 2009
আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন প্রায়ই ভুতের গল্প শুনতাম। ছোটদের জন্যে ভুতের গল্পের বই প্রায় সব বইয়ের দোকানে পাওয়া যতো। আমি তখন প্রায় নিয়মিত ভুতের গল্পের বই কিনতাম। বইয়ের দাম ছিল দুই আনা থেকে আট আনা। যাক এসবতো বইয়ের ভুতের গল্প। এবার আমি নিজের জীবনের ভুতড়ে কিছু গল্পের কথা বলছি।
১। একবার মায়ের সাথে মামার বাড়ি গিয়েছিলাম আমি ও আমার ছোট ভাই ইসহাক। সে সময় আমার মা সুযোগ পেলেই বিকেল বেলা মামার বাড়ি যেতো। আবার সন্ধ্যার কিছু কাছাকাছি সময়ে ফিরে আসতো। মা ফিরে আসার আগেই আমি আর ইসহাক বাড়ির পথে রওয়ানা দিলাম। কিন্তু ঠিক সময়ে বাড়ি ফিরতে পারলাম না। ওদিকে মাও বাড়ি ফিরে এসেছে। আমি অনেক চেস্টা করেও ইসহাককে খুঁজে পেলাম না। মা মনে করেছেন আমি ইসহাকের সাথে মারামারি করেছি। বাবা থখনও বাড়ি ফিরেননি। বাবা এলে রাত ন’টা পর্যন্ত ইসহাককে খুঁজে পাওয়া গেলো বড় মসজিদের ভিতর। সে খুব আরাম করে খুব আরাম করে ঘুমাচ্ছিল। অনেক ডকে তাকে ঘুম থেকে তোলা হলো। কেন সে মসজিদে গেলো সে ব্যাপারে কিছুই বলতে পারলোনা।
২। আমি তখন ক্লাশ নাইনে পড়ি। থাকতাম বারির কাচারি ঘরে। স্বাধীন ভাবে চলাফেরা করার জন্যেই এই ব্যবস্থা করেছিলাম। এ সময়ে আমি নিয়মিত ছবি আঁকতাম। বিশেষ করে রবীন্দ্র নাথ, নজরুল, শরত্চন্দ্র ও বিদ্যাসাগরের ছবি আঁকতে ভালবাসতাম। শরত্চন্দ্রের একটি খুব ভাল ছবি এঁকে বাঁধাই করে রেখেছিলাম। ছবিটা আমার পড়ার টেবিলের পাশে দেয়ালে টাংগানো থাকতো। হঠাত্ একদিন দেখি বাইরে থেকে দেয়ালে কে যেন তালি বাজানোর মতো আওয়াজ করছে। তাড়াতাড়ি বেরিয়ে গিয়ে তাকে ধরতে গেলাম। দেখি কেউ নেই। এ রকম বেশ ক’দিন হওয়ার পর সবাইকে বিষয়টা জানালাম। কেউ বিশ্বাস করলোনা। রাত ন’টা দশটার দিকে এ ঘটনা ঘটতো। একদিন সবাই পাহারা দিতে লাগলো। অন্ধকার রাত। ঠিক দশটার দিকে দেয়ালে টর্চের আলো ফেলে সবাই দূরে অপেক্ষা করতে লাগলো। ঠিক সময়ে আওয়াজ হলো , কিন্তু কিছুই দেখা গেলনা। ওই আওয়াজে ঘরের ভিতরে টাংগানো শরত্চন্দ্রের ছবিটা পড়ে গেলো। আমার মেজো জেঠিমা বললেন, ছবিটার দোষ। মুসলমানের ঘরে এ রকম ছবি থাকা ভালো না। অগত্যা আমার হাতে আঁকা প্রিয় ছবিটা পানিতে ফেলে দিলাম। ঘটনাটার আজও কোন সুরাহা হয়নি।
৩।
এটা ১৯৬০ সালের ঘটনা। শিক্ষা সপ্তাহের নাটক করে আমি বাসায় ফিরছিলা। হোস্টেল ছেড়ে বাসায় কেন উঠেছিলাম তা আজ আর মনে নেই। ঢাকা কলেজ অডিটরিয়ামে নাটক মন্চস্থ হয়েছিল। অভিনয় করেছিল বুলবুল, ইকবাল বাহার চৌধুরী, কেরামত মওলা, নুরুল হক বাচ্চু সহ আরও অনেকে। আমি ছাড়া বাকীরা সবাই সিনেমা নেমেছে। নাটক শেষে আমি নিউ মার্কেট হয়ে ইউনিভার্সিটির ভিতর দিয়ে এসে হাইকোর্টের কাছে পড়লাম। হঠাত্ মনে হোল সাদা কাপড় পরা কতগুলো মানুষ লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হাত তালি দিলাম। গাণ গাইলাম। কিছুতেই সাদা কাপড় পরা মানুষ গুলো নড়ছেনা। আমি ছিলা একেবারেই একলা। চিন্তা করছি কি করবো। সাহস করে সামনে এগিয়ে গেলাম। কাছে গিয়ে দেখলাম সাদা মানুষ গুলো হচ্ছে হাইকোর্ট বাউন্ডারীর সাদা পিলার।